জীবন নিয়ে ছেলেখেলা নয়! । Sothik News

সীমান্তঘেষা পশ্চিমের জেলাগুলোয় লকডাউন চলছে মাসের ওপর। সে সব জায়গায় পরিস্থিতির উন্নতি হয় নাই, সংক্রমন ও মৃত্যুর সংখ্যা বা হারও কোনটাই কমে নাই। দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। তারপরও আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপকরা নতুন ভ্যারিয়েন্ট মোকাবিলায় ‘লকডাউন’কেই কেন ধন্বন্তরী বলে ধরে রেখেছেন আমি বুঝতে অক্ষম। গত বছর প্রথম যে নমুনাটি আমাদের দেশে হানা দেয় তা মোকাবিলার জন্য বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া স্যানিটাইজার ব্যবহার মাষ্ক পরিধান, গড়ম পানি দিয়ে গড়গড়া আদা চা লেবু চা ভাপ নেওয়া-  সর্বোপরি লকডাউনের মত কর্মপন্থা কার্যকর ছিল। কিন্তু নানা রূপ পরিগ্রহ করতে করতে শেষ পর্যন্ত ইন্ডিয়ান বা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট হিসেবে যে ভাইরাসটি বর্তমান সময়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এটির আক্রমন কৌশল ভিন্ন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই ভ্যারিয়েন্ট বাতাসে উড়ে বা ঘুরে বেড়ায় না যে পথেঘাটে কাউকে পেলে অমনি তার ঘার মটকে দেবে। এই ভাইরাস বাসা বেধে আছে মানুষের দেহে, ছড়াচ্ছে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে, সান্নিধ্যে আসা আক্রান্ত ব্যক্তির কথা বলা, হাঁচি কাশি বা শ্বাষ প্রশ্বাষের মাধ্যমে। পরিবারের একজন থেকে অন্যদের মাঝে। সে জন্য জোর দেওয়া হয়েছে মাষ্ক পরিধান এবং ব্যক্তিদুরত্ব বজায় রাখার ওপর।

অথচ আমরা যেটা করছি- লকডাউনের নামে মানুষকে ধমকে ভয় দেখিয়ে পিটিয়ে ঘরে নিয়ে তুলছি। করোনা যেন বিএনপি জামাত- লাঠি বন্দুক হামলা মামলা দিয়ে সাইজ করা যাবে! অথচ বাস্তবতা হচ্ছে এইভাবে জবরদস্তি ঘরে আটকে রাখার ফলে সংক্রমনের ঝুঁকি তিনগুন চারগুন বেড়ে যাওয়ার আশংকা তৈরী হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর পাওয়া যাচ্ছে এক পরিবারে একজন আক্রান্ত হলে অল্প সময়ের মধ্যে অন্যরাও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এবং এ ঘটনাগুলো ঘটছে নিম্নবিত্ত মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোয় যেখানে অল্প জায়গায় অধিক সংখ্যক মানুষের বাস। এখন ঢেউ এসে লাগছে রাজধানী শহরেও। সরকারি হাসপাতালগুলোয় আইসিইউ সংকটের খবর বের হয়েছে।

এর মধ্যে চলছে সাত দিনের ‘সর্বাত্মক লকডাউন’। এই লকডাউনের কিঞ্চিৎ সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। এক. বাইরের জেলা থেকে করোনা আক্রান্ত মানুষের ঢাকায় আসা ঠেকানো, দুই. ঘরের বাইরে সংক্রমনের ঝুঁকি কিছুটা কমানো। কিন্তু এই ঝুঁকি কমাতে গিয়ে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে প্রান্তিক হতদরিদ্র এবং নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত মানুষগুলোকে। এই জনগোষ্ঠির অধিকাংশ মানুষ সারাদিন বাইরে থাকে নানাবিধ কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে দেহে এন্টিবডি তৈরী করে থাকে। ঘরে নিয়ে তোলার কারনে এরা একদিকে যেমন পুরো পরিবারকে আক্রান্ত করে ফেলতে পারে তেমনি কাজকর্ম না করায় নিজেরাও ইমিউন ডিফেয়িন্সিতে চলে যেতে পারে। আর তেমনটা হলে নেমে আসবে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপক বা স্বাস্থ্য বিভাগের অযোগ্যতা অপদার্থতা চুরি দূর্নীতির কথা নতুন করে কিছু বলার নাই, তবে এ কথা নি:সন্দেহে বলা যায় গত পঞ্চাশ বছরে এমন উজবুক হঠকারি অপরিনামদর্শী ব্যবস্থাপনা দেখা যায় নাই। চুরিবিদ্যা ছাড়া এরা আর কোন বিদ্যায় পারদর্শী বলে এখনও প্রমান পাওয়া যাচ্ছে না! এপ্রিল-মে মাসে যখন ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ভারত দাপাচ্ছে তখনই আশংকা করা হয়েছিল বাংলাদেশে এটা ঢুকে গেলে সামাল দেওয়া কঠিন হবে। আর তা ঢুকবে বর্ডার দিয়ে। শুধুমাত্র ইমিগ্রেশন চেকপোষ্টগুলো বন্ধ করা হলো, অবারিত রইলো চোরাচালানের মাধ্যমে মানুষের আসা যাওয়া। পশ্চিমের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় হাতে গোনা কয়েকটা ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট। এর বাইরে শতশত মাইল সীমান্তজুড়ে অসংখ্য চোরাচালান পয়েন্ট দিয়ে গরু ভেড়া বকরী ফেনসিডিলের সাথে মানুষও চোরাচালান হয়। এগুলোর তদারক সমন্বয় বা নিয়ন্ত্রন করে নানা ধরনের বাহিনীর এক শ্রেণীর অসাধু লোকজন যারা টাকা দিয়ে বর্ডারে পোস্টিং কেনে। ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট বন্ধ হলে এইসব চোরাচালান রুট দিয়ে হাজার হাজার মানুষ ভারত থেকে আসা যাওয়া করেছে। ভাইরাসটি এনেছে মুলত: এরাই। সরকার যদি একইসাথে চোরাচালান রুটগুলোও বন্ধ করতে পারতো তাহলে আমরা মোটামুটি নিরাপদই ছিলাম।

প্রথম যেদিন খবর বেরুলো সীমান্তবর্তী চাপাই নবাবগঞ্জ করোনায় আক্রান্ত সেদিনই বুঝেছিলাম কারবার হয়ে গেছে। বর্ডার তো খোলা! এরপর সাতক্ষীরা। যশোর রাজশাহী নওগা। সীমান্তবর্তী উত্তর বা পূর্বের জেলাগুলোয় কিন্তু সেই হারে সংক্রমন নাই। তার অর্থ পশ্চিমের জেলাগুলোর সীমান্ত দিয়েই মানুষ চোরাচালানটা বেশী হয়ে থাকে। আক্রান্ত জেলাগুলোয় দীর্ঘদিন যাবত লকডাউন বলবৎ থাকার পরও পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটার কারন- প্রথমত: লকডাউনের মাধ্যমে মানুষকে ঘরে নিয়ে তোলায় পরিবারসুদ্ধ আক্রান্ত হয়ে পড়ছে, দ্বিতীয়ত: এসব জেলায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা নাই। প্রধানমন্ত্রী মহোদয়া গত বছরই বলেছিলেন প্রতিটি জেলা হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট বসানোর জন্য, তার কথা কেউ শোনে নাই। প্রশিক্ষিত টেকনলজিস্ট নিয়োগের ঘোষনা এখনও ফাইলে বন্দী। ফলে জেলায় জেলায় এখন মানুষ অক্সিজেনের অভাবে মরতে শুরু করেছে। হাইফ্লো অক্সিজেনের নজল ক্যানোলাই নাই! এমন করিৎকর্মা সরকার বাহাদুর আমাদের- উন্নয়নের মহাসড়কে উড়াল দিয়ে চলছে কিন্তু এক যুগে জেলা উপজেলায় জীবন বাঁচানোর  ন্যুনতম চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করতে পারে নাই! হাসপাতাল আছে চিকিৎসা ব্যবস্থা নাই কোটী কোটী টাকার যন্ত্রপাতি আছে চালানোর লোক নাই। এতদিন যানবাহন চালু ছিল, সামর্থবানরা এ্যাম্বুলেন্স মাইক্রো বা গাড়ী ভাড়া করে- যাদের পক্ষে সম্ভব হয় নাই বাসে লঞ্চে ট্রাকে ভ্যানে চেপে রোগীকে ঢাকায় নিয়ে এসেছে। দুইদিন যাবত যানবাহন বন্ধ, মরনাপন্ন রোগীদের ঢাকায় আনার সুযোগ নাই। শুধুমাত্র অক্সিজেনের অভাবে দাপাতে দাপাতে অনেকে মারা যাচ্ছে। আশংকা করা হচ্ছে লকডাউন যদি এভাবে চলতে থাকে, সংখ্যা আরও বাড়বে। অথচ সরকারের উচিত ছিল স্থানীয়ভাবে মানুষকে যখন বাঁচাতে পারছে না ক্রুশিয়াল প্রতিটা রোগীকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় এনে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, যেমনটা কোন মন্ত্রী এমপি বা ভিআইপি ঢাকার বাইরে অসুস্থ হয়ে পড়লে করা হয়।

করোনা বিষয়ে আমি কোন বিশেষজ্ঞ নই। তবে বিভিন্্ন তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষন এবং দেড় বছরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলতে পারি অন্যান্ন ভ্যারিয়েন্টের মত করোনার এই ভ্যারিয়েন্টও আর চার থেকে ছয় সপ্তাহ বিধ্বংশীরূপে থাকতে পারে। ইতিমধ্যে মানুষের দেহে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠতে থাকলে ধীরে ধীরে তা দুর্বল হয়ে পড়বে। রূপ বদলে নতুন কোন ভ্যারিয়েন্ট হয়ে হানা দিতে পারে তবে চলতি ভ্যারিয়েন্ট আর খুব বেশীদিন রাজত্ব করতে পারবে না। পাশের দেশ ভারতে এর তান্ডব কমে আসতে শুরু করেছে।

তবে এই সময়ের মধ্যে অনেককে আক্রান্ত করবে। গতবারের মত এবারও প্রথম দফায় মারা যাবে বা যাচ্ছে যারা করোনার সাথে হাই ডায়াবেটিস কিডনী বা হার্টের জটীল রোগে ভুগছেন তারা। অনেকে ভয়ে হার্ট এ্যাটাক করেও মারা যাচ্ছেন। সপ্তাহ দু’য়েকের মধ্যে মৃত্যুর হার এবং সংখ্যা কমে আসার কথা। তবে সরকারি হুকরামি-হঠকারিতার পরিনতিতে বা কিছুই করতে না পারার ব্যর্থতা ঢাকতে অপ্রয়োজনীয় লকডাউনের মাধ্যমে মানুষকে ঘরবন্দী করে ফেলার কারনে সংক্রমন বেড়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এমনিতেই জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি আশা করা যায় কিন্তু গতবারের মত এই ঈদেও যদি সরকার বাস লঞ্চ ট্রেন তথা গনপরিবহন বন্ধ রেখে মানুষকে গাদাগদি করে বাড়ী ফিরতে বাধ্য করে তাহলে জুলাইয়ের শেষ নাগাদ থেকে পরিস্থিতির আবার অবনতি হয়ে চলতে পারে যা গড়াবে পুরো অগাস্ট জুড়ে।

এই অবস্থা থেকে বাঁচতে নিজে সাবধান থাকা, মাষ্ক পরিধান করা, বাসায় বা বাসার বাইরে ন্যুনতম ব্যক্তি দুরত্ব বজায় রাখাই এখন একমাত্র ভরষা। লকডাউন- সামাজিকভাবে অক্ষমের আষ্ফালন হিসেবে বিবেচিত। টীকা হচ্ছে এক ধরনের সান্তনা। আসবে আসছে, প্রথম ডোজ দ্বিতীয় ডোজ, তারপর কবে এন্টিবডি তৈরী হবে কবে করোনা ঠেকাবে! ততদিনে হয়তো দেখা যাবে ডেল্টাই আর নাই! তারপরও সুযোগ পাওয়ামাত্রই টীকা নিয়ে নেয়া ভাল। আর কিছু না হোক এতে মনে সাহস বাড়বে, দৃড় মনোবল ইমিউনিটি বাড়ানোর জন্য সহায়ক।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় অযোগ্য অথর্ব অপদার্থ ব্যবস্থাপনার কিছু করার আছে বলে দেখছি না। এরা রাতারাতি জেলা উপজেলায় অক্সিজেন ব্যবস্থা বা আইসিইউ বসাতে পারবে না, দৈনিক কমপক্ষে পঞ্চাশ হাজার করে নমুনা পরীক্ষা করতে পারবে না, হাজার হাজার আক্রান্তের চিকিৎসার ব্যবস্থাও করতে পারবে না। এই ধরনের পরিস্থিতিতে যেটা অবশ্যই করা দরকার- আক্রান্তদেরকে আলাদা করে ফেলা, সে সক্ষমতাও এদের নাই। গত বছর তাও আইসোলেশন কোয়ারেন্টাইন নামে দু’টো কথা বলা হতো, এবার ওসব শুনি না। চিকিৎসাসুবিধা যেখানে অপর্যাপ্ত সেখানে বেশী বেশী টেস্টের মাধ্যমে সনাক্ত করা এবং আক্রান্তদেরকে আলাদা করে ফেলা ছাড়া গনসংক্রমন ঠেকানোর কোন বিকল্প নাই- কথাটা বহুবার বহুভাবে বলা হয়েছে। কেউই কানে তোলেন নাই। এদিকে সরকারের দেয়া পরিসংখ্যানের চাইতে বাস্তবতা ভিন্ন। অনেকে ঘরে থেকে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন নিজেনিজে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হচ্ছেন, এরা কোথাও পরীক্ষা করান না বা চিকিৎসা নিতে নাম লেখান না। সরকারি পরিসংখ্যানে এদের হিসাব আসে না। অনেকে করোনায় মৃত্যুবরন করেন কিন্তু নানা কারনে নাম তালিকায় ওঠে না। আমাদের মিডিয়াগুলো এতটাই সেবাদাস, সরকারি সূত্রে প্রকাশ করা তথ্যের বাইরে অন্য কোন তথ্য পরিবেশন করে না। ফলে জনগন বাস্তব চিত্র পায় না।

ভারত থেকে ‘চোরাচালান’ হয়ে আসা ডেল্টা ইতিমধ্যেই বিধ্বংশী রূপ পরিগ্রহ করে ফেলেছে। জীবন বাঁচাতে না পারি- জীবন নিয়ে যেন ছেলেখেলা না করি- সরকার বাহাদুরের কাছে এ অবস্থায় একটাই প্রার্থনা!

লেখক  

প্রবীণ সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও মিডিয়া ব্যাক্তিত্ব

অবিভক্ত সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক নেতা 



0 Comments:

Post a Comment