সরকারি বাঙলা কলেজ ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি | Sothik News

 

বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠার মহান উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় সরকারি বাঙলা কলেজ। ভাষা আন্দোলন আর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে কলেজটি। বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বেশ কয়েক মহৎ মানুষের নাম। অনেকেরই চিন্তা ও পরিশ্রমের সম্মিলিত ফসল সরকারি বাঙলা কলেজ। তবে অনেক মনীষী রেখেছেন অতিগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাদের মধ্যে প্রথমে যার নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণযোগ্য, তিনি ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি বাংলা একাডেমিতে কাজ করেছিলেন ‘পূর্ব পাকিস্তানি ভাষার আদর্শ অভিধান’ প্রকল্পের সম্পাদক হিসেবে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মাধ্যমে কোনো ভাষা- এ তথ্য অনুসন্ধান করে তিনি জানতে পারেন, পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উর্দু কলেজ। ওই আদলে পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা পঠন-পাঠনবিষয়ক একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কীভাবে তৈরি করা যায়, এ জন্য বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও যোগাযোগ শুরু করেন তিনি। সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ করলে শিক্ষা বিভাগ থেকে তাকে জানানো হয়, এই আদলে পূর্ব পাকিস্তানে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে মিরপুরে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে বাংলা নামের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে বটে তবে তা মাধ্যমিক পর্যায়ের। করাচির উর্দু কলেজের আদলে ঢাকায় কীভাবে বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করা যায়, এ লক্ষ্যে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর উদ্যোগে বাংলা একাডেমিতে একটি সভা আহ্বান করা হয়। ওই মোতাবেক ১৯৬১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি সভাকক্ষে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।


মনীষী ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ‘ঙ’ শব্দকে জোর প্রস্তাব করেন ‘বাঙলা কলেজ’ লেখার জন্য। কারণ ‘ঙ’ যেমন একটি আত্মনির্ভরশীল বর্ণ, যা ‘ং’য়ের মতো মুখাপেক্ষী নয়- তেমনি বাঙলা কলেজ হবে অমুখাপেক্ষী আর স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ঠিক ‘ঙ’-এর মতো।



 

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য সন্ধান করেছিলেন, গুরুত্ব দিয়েছিলেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে ও মাতৃভাষার প্রতি দরদি- এমন ব্যক্তিদের। এ বিষয়ে তিনি প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁকে যোগ্য মনে করেছিলেন। ঢাকার বকশীবাজার নবকুমার ইনস্টিটিউটে ভাড়ার বিনিময়ে ‘বাঙলা কলেজ’ যাত্রা শুরু করে ১৯৬২ সাল থেকে। যেহেতু নবকুমার ইনস্টিটিউটে দিনের বেলা তাদের নিজস্ব শিক্ষা কার্যক্রম চালু ছিল, সেহেতু নতুন এ কলেজটি যাত্রা শুরু করে নৈশ কলেজ হিসেবে। নৈশ কলেজ হলেও প্রথম সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে এখানে চালু হয় সহশিক্ষা কার্যক্রম। প্রতিষ্ঠালগ্নের অধ্যক্ষ আবুল কাশেম দীর্ঘকাল অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন। নিজের সিদ্ধান্ত, মমতা দিয়ে সাজিয়েছেন কলেজটিকে। তার এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পরে কলেজ ছাত্রাবাসের নামকরণ করা হয় তার নামে।


বকশীবাজারে নবকুমার ইনস্টিটিউটে কলেজের কার্যক্রম সচল ছিল প্রায় দুই বছর। এর মধ্যে নানা দিক থেকে কলেবর বাড়ে কলেজের স্থায়ী ক্যাম্পাস করার জন্য বেসরকারি পর্যায়ের কিছু বিদোৎসাহী এগিয়ে আসেন। তাদের সাহায্যে মিরপুর ১-এ প্রায় ১৬ দশমিক ১৮ একর জমির ওপর নির্মিত হয় কলেজের স্থায়ী ক্যাম্পাস। এরই মধ্যে শুরু হয় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ।


স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালে পুরো জাতি মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এ কলেজটি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর নির্যাতন কেন্দ্রে পরিণত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙলা কলেজে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করে। শ্রেণিকক্ষ, ভবন ও অধ্যক্ষের বাসভবন ছাড়াও বিশাল এই ক্যাম্পাস ছিল পুকুর, ডোবা, খাল, নালা এবং বিভিন্ন গাছপালায় পুরিপূর্ণ একটি জঙ্গলাকীর্ণ স্থান।


মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি বাহিনী এবং তার সহযোগীরা বাঙলা কলেজে স্থানীয় বাঙালি ও মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে হত্যা করে এবং সম্ভ্রম কেড়ে নেয় অসংখ্য মা-বোনদের। এখানে রয়েছে গণকবর, লাশ ফেলার কুয়া, জোড়া গাবগাছ।


১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তার সহযোগীরা এই জোড়া গাবগাছের কাছে মুক্তিকামী বাঙালিদের ধরে এনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে হত্যা করত। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস বিভীষিকাময় গণহত্যার চিহ্ন হিসেবে লাশের স্তূপ ছিল এখানে। দেশ স্বাধীনের পর আবারও বাঙলা কলেজ তার শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। মুজিববর্ষের প্রাক্কালে ওই নারকীয় হত্যাকা-কে এ প্রজন্মের সামনে উপস্থাপনের লক্ষ্যে অধ্যক্ষ ফেরদৌসী খানের নেতৃত্বে সরকারি বাঙলা কলেজ ক্যাম্পাসের বধ্যভূমি অনুসন্ধান ও চিহ্নিতকরণের লক্ষ্যে দুটি কমিটি গঠন করা হয়। পরে দুই কমিটির সদস্যদের সমন্বয়ে একটি ৫ সদস্যের কোর কমিটি গঠন করা হয় বাংলা বিভাগের প্রফেসর মোহম্মদ আবুল খায়েরকে আহ্বায়ক করে।


কোর কমিটি একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করে। সেখানে কলেজ ক্যাম্পাসের ৯টি স্থানকে চিহ্নিত করা হয়। ওই স্থানগুলো মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে। সংশ্লিষ্ট কমিটি এই সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত হিসেবে ১৯৭২ সাল ও পরবর্তী বিভিন্ন সময়ের পত্রিকার রিপোর্ট, প্রকাশিত গ্রন্থ ও প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য সংযোজন করে। পরে এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিষয়টি ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট সভাপতি অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুনের গোচরে আনলে তার নির্দেশনায় সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় তিনটি স্থানে বধ্যভূমি সংরক্ষণে স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়- ১. সরকারি বাঙলা কলেজ গণহত্যা স্মৃতিফলক; ২) গণহত্যার সাক্ষ্য বহনকারী আমগাছ, সরকারি বাঙলা কলেজ, ঢাকা ও ৩. গণহত্যার সাক্ষ্য বহনকারী জোড়া গাবগাছ।


মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত এমনই বর্বরতার স্মৃতিচিহ্ন বহন করে চলেছে সরকারি বাঙলা কলেজ।


মিরপুর ছিল মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণক্ষেত্র। সরকরি বাঙলা কলেজ বধ্যভূমি শুধু মিরপুরেই নয়, বাংলাদেশের অন্যতম একটি বধ্যভূমি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় সহযোগীরা বাঙলা কলেজে অজ¯্র মুক্তিকামী মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়জুড়েই বাঙলা কলেজ ও এর আশপাশে নৃশংস হত্যাকা- চলেছে, হয়েছে নারী নির্যাতন। বিজয়ের মুহূর্তে কলেজজুড়ে পড়ে ছিল অজ¯্র জবাই করা দেহ, নরকঙ্কাল, পচা-গলা লাশ। বিভীষিকাময় গণহত্যার চিহ্ন ফুটে ছিল সর্বত্র। এই প্রাঙ্গণে চাপা পড়ে আছে অসংখ্য মানুষের হাড়-কঙ্কাল। এই প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে আছে সহ¯্র হাড়পাঁজরের গল্প।


মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সামনে রেখে সরকারি বাঙলা কলেজে নির্মিত গণহত্যার স্মৃতিফলক যুগ যুগ ধরে প্রজন্মকে মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগের গৌরবময় ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এবং জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পুণ্যস্মৃতির প্রতি শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধাশীল করতে নিশ্চিতভাবে অবদান রাখবে।

লেখক

জাকিয়া ফেরদৌস : প্রভাষক, সমাজকর্ম বিভাগ, সরকারি বাঙলা কলেজ, ঢাকা

0 Comments:

Post a Comment